প্রজাতন্ত্র দিবসে দিল্লি অবরুদ্ধ, লালকেল্লায় পতাকা উড়াল কৃষকরা

দিল্লির লালকেল্লায় পৌঁছে আন্দোলনের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন আন্দোলনরত কৃষকরা। সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস, লাঠি চার্জ। কিছু দিয়েই পুলিশ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি প্রতিবাদী কৃষকদের। তিন সীমানায় সব ব্যারিকেড ভেঙে চুরমার হয় মঙ্গলবার। পথ পাল্টে লালকেল্লায় গিয়ে কৃষকদের মধ্যে থেকে আওয়াজ ওঠে ‘অকুপাই দিল্লি’।

পুলিশের ঘোষণা ছিল, মঙ্গলবার সকাল ১২টা নাগাদ কৃষকদের ট্রাক্টর মিছিল নির্দিষ্ট তিনটি রুটে গিয়ে আবার উৎসস্থলে ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো। সকাল ৮টা থেকে লাগামছাড়া গতিতে দিল্লির দিকে ধেয়ে আসতে থাকে মিছিল। পুলিশের বাধা কেউ মানেননি। আর তাই নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছে দিল্লির নয়ডা মোড়, আইটিও মোড়, এসবিটি এলাকা।

ভারতের ৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবসে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে এভাবেই অবরুদ্ধ করা হয় রাজধানী দিল্লি।

এরপর, দিল্লির একা্ংশে বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা। আংশিক বন্ধ করা হয় মেট্রো পরিষেবাও। এ সময় দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কৃষক আন্দোলনের নেতারা অনুরোধ করেন শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলন করতে। তবু দুপুর পর্যন্ত কৃষক আন্দোলনের উত্তাপ কমেনি, বরং দিল্লির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন নতুন সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। লালকেল্লা থেকে একবার কৃষকদের সরানোর পর, নতুন করে ট্রাক্টরে আরো প্রতিবাদী কৃষকরা এসে ভিড় করেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন সেটাই দেখল দিল্লি। দুপুরের পর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ বৈঠকে বসেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

আজ মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারী) দুপুরে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়, নিরাপত্তা ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিঙ্ঘু, গাজিপুর, টিকরি, মুকারবা চক, নাঙ্গলোই-এলাকায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। ২৬ জানুয়ারি দুপুর ১২টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ থাকছে। পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দিল্লি মেট্রোর বেশ কয়েকটি স্টেশনও। আইটিও মোড়ে যখন প্রাথমিক ঝামেলা হয়, তখনই বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় একাধিক মেট্রো স্টেশন।

পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে আসরে নামেন কৃষক আন্দোলনের সমর্থক মুখ্যমন্ত্রীরা। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌত ও পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহ কৃষকদের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। সংবাদ মাধ্যমে একই স্বর শোনা যায় আন্দোলনের মুখ যোগেন্দ্র যাদব, রাকেশ টিকায়েতদের গলাতেও। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি তাতে।

ট্রাক্টর প্যারেড ঘিরে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় দিল্লির আইটিও (আয়কর ভবন) চত্বর। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে কৃষকদের। ভাঙচুর চালানো হয় একাধিক বাসে।

ট্রাক্টর প্যারেডের জন্য নির্দিষ্ট রুটে অনুমতি দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। ওই সব রুটে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যারিকেড তৈরি করে রেখেছিল পুলিশ। কিন্তু প্রতিবাদী কৃষকদের একটি দল সেই রুট এড়িয়ে পৌঁছে যায় আইটিও চত্বরে। সেখানে পৌঁছতেই তাদের বাধা দেয়া হয়, তাতেই শুরু হয় কৃষক-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ। হাতাহাতি, সংঘর্ষে গোটা এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে আন্দোলনকারীদের। কিন্তু তার পরেও দীর্ঘক্ষণ আইটিও চত্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন কৃষকরা। দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে পরিস্থিতি।

এই সময়ই দেখা যায়, বেপরোয়াভাবে ট্র্যাক্টর চালাচ্ছে কৃষকরা। পুলিশকর্মীরাও উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে প্রাণরক্ষার চেষ্টা করছে। কৃষকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ। পাল্টা কৃপাণ হাতেও কৃষকদের দেখা গিয়েছে। সকাল ১০টায় নয়ডা মোড়ের চিত্রটা ছিল এমনই। পুলিশ লাঠি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি।

আইটিও মোড়ে দেখা গিয়েছে, কীভাবে ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান কৃষকরা। সেখানেও বিপুল সংখ্যায় ট্র্যাক্টর এসে পড়ে। মূলত দিল্লির সীমানা এলাকায় বেশি পুলিশ মোতায়েন থাকার কারণে দিল্লির ভেতরে পুলিশের আঁটুনি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই কারণে বিনা বাধায় এগিয়ে যেতে থাকেন কৃষকরা। আইটিও মোড় থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তর। সেখানে গিয়ে প্রতিবাদরত কৃষকরা হাজির হবেন কি না, তা নিয়ে বাড়তে থাকে চিন্তা।

প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন তিনটি নির্দিষ্ট পথে ট্রাক্টর মিছিল করার অনুমতি দেয় দিল্লি পুলিশ। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে সকালেই মিছিল শুরু করেন আন্দোলনরত কৃষকরা। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ট্র্যাক্টর নিয়ে রাজধানীতে ঢুকতে শুরু করে কয়েক হাজার কৃষক। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ছোঁড়ার পাশাপাশি লাঠি চার্জ করে পুলিশ।

ভারতের নতুন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লিতে ট্রাক্টর নিয়ে মিছিল করবেন আন্দোলনকারী কৃষকরা এটা আগেই জানানো হয়েছিল। ‘কৃষাণ প্যারেড’ নামের এই মিছিল স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার পর শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সকাল ৮টার মধ্যেই রাজধানীর সীমান্তে হাজার হাজার লোক জড়ো হন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, এতে নজিরবিহীন দৃশ্যের অবতারণা হয়। দিল্লি ও হরিয়ানাকে বিভক্তকারী সিংঘু সীমান্তে ও ভারতের রাজধানীর পশ্চিম অংশে টিকরি সীমানায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার লোক পতাকা হাতে হেঁটে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যান, তাদের অনেকে আবার ট্রাক্টর নিয়েই ঢুকে পড়েন।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, প্রজাতন্ত্র দিবসে তিনটি নির্দিষ্ট পথে ট্রাক্টর মিছিল করার অনুমতি দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ, কিন্তু সরকারি নির্দেশকে উড়িয়ে দিয়ে সিংঘুতে সকালেই মিছিল নিয়ে নেমে পড়েন কৃষকরা। পাঁচ হাজার কৃষকের জমায়েতের সামনে অসহায় হয়ে পড়েন পুলিশ সদস্যরা, তারা বারবার ধীর গতিতে এগোনোর অনুরোধ করলেও কৃষকরা দ্রুতগতিতে দিল্লির দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।

প্রসঙ্গত, দফায় দফায় কৃষক ও নরেন্দ্র মোদি সরকারের মধ্যে বৈঠকের পরও ভারতের নয়া কৃষি আইন নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে কোনো সমাধান আসেনি। সম্প্রতি সরকার দেড় বছরের জন্য এ আইন কার্যকর না করার প্রস্তাব দিলেও তাতে রাজি হয়নি কৃষকেরা।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এ পর্যন্ত দুই পক্ষের মাঝে ১০ দফা বৈঠক হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার কৃষি আইন প্রত্যাহার অনড় কৃষি সংগঠনগুলোর দাবি আংশিক মেনে শেষ বৈঠকে সরকারের প্রস্তাব ছিল ওই আইন দেড় বছর কার্যকর না করার। সেই প্রস্তাবেও সায় দেয়নি কৃষক সংগঠনগুলো।