বাংলাদেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ বাড়ছে। তবে প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের পর শুক্রবার (৯ মে) পর্যন্ত দুই মাসে ১৩ হাজার ৭৭০ জনের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২১৪ জন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাংলাদেশে এখনো সম্পূর্ণ মাত্রায় কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে এটা বলা যাবে না। আর তাই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব পরিস্থিতি তালিকায় বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে তারা বর্ণনা করেছে ‘ক্লাস্টার অফ কেইসেস’ বা গুচ্ছ সংক্রমণ বলে।

শুক্রবার (৮ মে) এ তথ্য নিশ্চিত করেন ঢাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ বিষয়ক কম্যুনিকেশন ম্যানেজার কেটলিন কনস্ট্যানিন।

১৩ এপ্রিল বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর আয়োজিত কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে করা স্বাস্থ্য বুলেটিনে অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। সেটি যেন ব্যাপকভাবে না ছড়ায় সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে।

কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮ মে পর্যন্ত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ৮ মে সকাল ১০টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় একমাত্র ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মিয়ানমারে ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এরই প্রেক্ষিতে মেইল প্রেরণ করে সারাবাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে। ফিরতি মেইলে বলা হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ বিষয়ক কম্যুনিকেশন ম্যানেজার কেটলিন কনস্ট্যানিনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য।

কেটলিন কনস্ট্যানিন, ‘বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সব বিভাগেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ হয়েছে। দেশের সকল জেলাতেই এখন কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলছে না কারণ বাংলাদেশ সরকার এখনো কন্টাক্ট ট্রেসিং করে যাচ্ছে। আমরা সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে কাজ করি। তারা আমাদের এই কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে। যখন কোনো দেশ কন্টাক্ট ট্রেসিং আর করতে পারবে না বলে জানায় তখন আমরা সেই দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করি।’

তিনি বলেন, ‘যেকোনো ট্রান্সমিশন ঘোষণা করার আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকে। প্রথমত হলো যখন কোনো দেশে সংক্রমণ একদমই পাওয়া যায় না। সেটাকে আমরা ফেইজ-১ বলে থাকি। যখন সেই দেশে এক থেকে দুইটা বা কিছু কেইস পাওয়া যায় যার মাঝে কেউ হয়তো বা দেশের বাইরে থেকে এসেছে ও তার সংস্পর্শে এসেছে তখন তাকে আমরা বলি ফেইজ-২। এই ফেইজকে বিক্ষিপ্ত ট্রান্সমিশন বলা যেতে পারে। সচরাচর এই ফেইজেও কোভিড-১৯ সংক্রমণের মাত্রা সীমিত থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপরেই থাকছে ফেইজ ৩ যেখানে বাংলাদেশ বর্তমান অবস্থান করছে আমাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী। এই ফেইজে বা লেভেলে দেশে সংক্রমণের মাত্রা বাড়বে। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা বা লোকালয়ে সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে ও এপি সেন্টার হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে যেমন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে রোগীর সংখ্যা বেশি আর তাই এই দুই এলাকায় কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে এটা বলা যায়। এই দুই স্থানে কন্টাক্ট ট্রেসিং করেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না। কিন্তু এই দুই এলাকার সঙ্গে আবার দেশে নতুভাবে যেখানে আক্রান্ত হচ্ছে তাকে মেলানো যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘যখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও কন্টাক্ট ট্রেসিং সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হবে তখনই আমরা একে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলবো। অর্থাৎ সকল এলাকায় কন্টাক্ট ট্রেসিং বন্ধ আর এলাকাভিত্তিক ভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে এমন তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর যদি আমাদের দেয় তবে আমরা সেটাকে পরিবর্তন করে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলবো।’

আমরা সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে কাজ করি যৌথভাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মূল কথা আমাদের একটাই। এক্ষেত্রে যদি সরকারের পক্ষ থেকে আমাদেরকে তথ্য দিয়ে বলা হয় কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে তবে আমরা সেটা প্রকাশ করব। আমাদেরকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে বাংলাদেশের অনেক এলাকাতে এখনো লেভেল-২ ও লেভেল-৩ ফেইজের সংক্রমণ চলছে। আর তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে ক্লাস্টার অফ কেইসেস উল্লেখ করা হয়েছে।’

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম রিজওয়ান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না। কারণ কন্টাক্ট ট্রেসিং এর উদ্দেশ্য হলো কমিউনিটি কন্টেইনমেন্ট। যখন পুরো সমাজে এটা ছড়িয়ে যায় তখন কন্টাক্ট ট্রেসিং এর প্রয়োজন বা প্রয়োগ খুব সীমিত। এক থেকে দেড় মাস আগে আইইডিসিআর কেস আইডেন্টিফিকেশনের পরপরই বহুখাতভিত্তিক সমন্বয় এর মাধ্যমে কন্টাক্ট ট্রেস করতে পারতো। কারণ তখন স্টেজ ওয়ান বা টু তে ছিলাম আমরা। কিন্তু এখন সেই ধাপ অনেক এলাকাতেই নেই।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ঢাকা নারায়নগঞ্জে স্টেজ ফোর পর্যায়ে আছি। সেখানে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে কন্টাক্ট ট্রেসিং যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রযোজ্য ক্ষেত্রেই সেটা করে যেতে হয় যেমন হাসপাতালের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কেউ আক্রান্ত হলে সেক্ষেত্রে কন্টাক্ট ট্রেসিং করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি গার্মেন্টসে কারও মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যায় তবে সেখানে কন্টাক্ট ট্রেসিং যুক্তিসঙ্গত না। আবার দেখা যায় আমরা এখনো অনেক জেলা ও উপজেলায় স্টেজ টু অথবা থ্রিতে আছি। এসব এলাকায় এখনো সম্ভব হচ্ছে কন্টাক্ট ট্রেসিং করা কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সেখানে যদি বাইরে থেকে কেউ যায় তবে সেক্ষেত্রে সংক্রমণের মাত্রা বাড়লে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, আমাদের এখানে এখনো নিয়ম মেনে যেসব স্থানে সম্ভব সেখানে কন্টাক্ট ট্রেসিং এর কাজ চলছে।’

বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে ক্লাস্টার অফ কেইসেস আকারে।

কেনো এমনটা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের এখনো কন্টাক্ট ট্রেসিং করা হচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ ক্ষেত্রে কন্টাক্ট ট্রেসিং করা যাচ্ছে না। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বিষয়ে আসলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

এ বিষয়ে আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও উনারা ফোন ধরেননি। এসএমএস দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা উত্তর দেননি।

এর আগে ২৫ মার্চ ও ২ এপ্রিল দেশে মৃদু আকারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে।