মুসলিম নাকি হিন্দু জানতে খুলতে বলা হচ্ছে প্যান্ট

এখনও ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) পক্ষে ও বিপক্ষের গোষ্ঠীদের অব্যাহত সং’ঘর্ষে জ্বলছে দিল্লি। এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হা’মলার শিকার হয়েছেন দেশটির সনামধন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরাও।

এই সং’ঘর্ষ চলাকালে সাংবাদিকদের বেধড়ক মারধর করা হয়েছে, মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাংবাদিক মুসলমান কিনা তা নিশ্চিত করতে তাকে প্যান্ট খুলতে বলা হয়েছে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দেশটির প্রসিদ্ধ সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এসব তথ্য নিশ্চিত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের নিশানায় পড়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বেধড়ক মারধর করা হয়েছে আরও দুই সংবাদকর্মীকে।

এর আগের দিন বিক্ষোভে উত্তপ্ত এলাকায় খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন এক বাঙালি সাংবাদিক। তিনি মুসলামান কি না তা যাচাই করতে তাকে প্যান্ট খুলতে বলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল টাইমস অব ইন্ডিয়ার চিত্র সাংবাদিক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এমন সাম্প্রদায়িক ত্রাসের শিকার হন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।

বিড়ম্বনাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভুক্তোভোগী সাংবাদিক জানান, উত্তেজনাপূর্ণ জাফরাবাদ অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি ও তার সহকর্মী সাংবাদিক। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মৌজপুর মেট্রো রেলস্টেশন এলাকায় একটি হিন্দু সংগঠনের কয়েকজন সদস্যের হাতে এ হেনন্তার শিকার হন তিনি।

তিনি জানান, সেদিন তার কপালে তিলক এঁকে দিতে চাইলে তিনি আপত্তি করলে ক্ষিপ্ত হয়ে যান ওই সংগঠনটির সদস্যরা। হিন্দু হলে তিলক আঁকতে আপত্তি কিসের প্রশ্ন করা হয় তাকে। এর ১৫ মিনিট পরেই এলাকায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয় এবং ‘মোদি’ ‘মোদি’ স্লোগানের মাঝে কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়।

এ সময় স্থানীয় একটি বাড়িতে আগুন লাগলে অগ্নিকাণ্ডের ছবি তুলতে গিয়ে আবারও বাধাপ্রাপ্ত হন তিনি এবং সেই একই ধরনের প্রশ্নের সম্মূখীন হন। তারা সাংবাদিক অনিন্দ্যকে বলেন, ‘আপনিও তো হিন্দু। তাহলে ওখানে কেন যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে।’

তবে তাদের কথায় কান না দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছবি তুলতে গেলে অনিন্দ্যকে একদল সশস্ত্র চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তারা তার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ঘটনার কিছু পরেই এক তরুণ এগিয়ে এসে সাংবাদিক অনিন্দ্যকে ফের পথরোধ করে হুমকি দেন ও জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই একটু বেশি চালাকি করছিস। তুই হিন্দু, না মুসলিম?’

এ সময় তারা সাংবাদিক অনিন্দ্যর ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার জন্য তাকে প্যান্ট খুলতে বলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে হাতজোড় করে অনেক অনুনয়-বিনয় করে কোনো মতে সেখান থেকে রেহাই পান ওই চিত্র সাংবাদিক। তবে তখনো বিপদ কাটেনি ওই সাংবাদিকের। অটোরিকশা নিয়ে ফেরার পথে ফের সশস্ত্র বাহিনীর মুখে পড়েন তিনি। তার অটোরিকশাচালক মুসলমান হওয়ায় ফের সশস্ত্র বাহিনীর রোষানলে পড়তে হয় তাকে।

তাদের মাঝপথে থামিয়ে ঘেরাও করেন চারজন সশস্ত্র যুবক। কলার ধরে দুজনকে অটো থেকে নামিয়ে মারধরের চেষ্টা করেন। সাংবাদিক পরিচয় এবং অটোচালক নির্দোষ, এমন কথা বলে অনেক অনুনয়ের পরে তারা ছাড়া পান।

এ ব্যাপারে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘মুহূর্তগুলো আমার পার হলো ভয়ানক আতঙ্কে। ওই অটোওয়ালাই যখন আমাকে অফিসে দিয়ে গেল, তখনো সে ভয়ে কাঁপছে। চলে যাওয়ার আগে শুধু বলল, সারা জীবনে কেউ আমাকে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করেনি কখনো।’